বাংলাদেশে জমির মালিকানার সঠিক চিত্র জানার জন্য খতিয়ানই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। কিন্তু জমি কেনাবেচা, নামজারি কিংবা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যেকোনো কাজে গেলে দেখা যায়, খতিয়ান এক ধরনের নয়। একই জমির জন্য CS, SA, RS, এমনকি BS নামে একাধিক খতিয়ান থাকতে পারে। প্রতিটিই আলাদা আলাদা সময়ে পরিচালিত ভূমি জরিপের ফল হিসেবে প্রস্তুত হয়েছে। তাই এগুলোর পার্থক্য না বুঝলে জমির প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এই নিবন্ধে CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, পার্থক্য এবং কোন খতিয়ান কখন ব্যবহার করা উচিত তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের পার্থক্য

খতিয়ান কাকে বলে?

ভূমি জরিপের সময় প্রতিটি মৌজার জমির দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, শ্রেণি, মালিকের নাম, দখলদারের নাম ও খাজনা সংক্রান্ত তথ্য সাজিয়ে যে সরকারি রেকর্ড তৈরি করা হয়, তাকে খতিয়ান বলে। একে Record of Rights বা স্বত্বলিপিও বলা হয়। খতিয়ানে জমির মালিকানা কার কাছে আছে তার লিখিত প্রমাণ থাকে, তাই এটি আদালত থেকে শুরু করে যেকোনো প্রশাসনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখা দরকার, খতিয়ান নিজে মালিকানার দলিল নয়; এটি মালিকানার প্রাথমিক প্রমাণ। বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগে ও পরে বেশ কয়েকটি বড় জরিপ সম্পন্ন হয়েছে, এবং জরিপের নাম অনুসারেই প্রতিটি খতিয়ানের নামকরণ করা হয়েছে।

CS খতিয়ান (Cadastral Survey)

CS খতিয়ানের নমুনা

CS অর্থ ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে। এটি উপমহাদেশে পরিচালিত সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ ভূমি জরিপ, যা ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়। ১৮৮৫ সালের বাংলা প্রজাস্বত্ব আইনের (Bengal Tenancy Act, 1885) আওতায় এই জরিপ পরিচালিত হয়। কক্সবাজারের রামু উপজেলা থেকে জরিপের কাজ শুরু হয়ে দিনাজপুরে শেষ হয়। তখন প্রতিটি ভূখণ্ডকে দাগ নম্বর দিয়ে ভাগ করে মৌজা নকশা প্রণয়ন করা হয় এবং তার ভিত্তিতে মালিকানার রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়।

সে সময় জমিদারি প্রথা চালু থাকায় CS খতিয়ানে জমিদার ও প্রজা উভয়েরই নাম লেখা থাকত। যেহেতু এই জরিপটি আমিনগণ সরেজমিনে জমি মেপে সম্পন্ন করেছিলেন, তাই CS খতিয়ানকে মূল মালিকানা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভিত্তিস্বরূপ ধরা হয়। আজও পুরনো মালিকানা বা ভোগদখল প্রমাণের জন্য আদালতে CS খতিয়ানের রেফারেন্স দেওয়া হয়। তবে এটি প্রায় শত বছরের পুরনো রেকর্ড, যাতে পরবর্তী সময়ে মালিকানা পরিবর্তনের তথ্য যুক্ত হয়নি; তাই একে একা চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

SA খতিয়ান (State Acquisition Survey)

SA খতিয়ানের নমুনা

১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের (State Acquisition and Tenancy Act, 1950) মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয় এবং জমির মালিকানা সরাসরি রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। এ আইনের আলোকে ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে যে খতিয়ান প্রস্তুত হয়, তা SA খতিয়ান নামে পরিচিত। পাকিস্তান আমলে তৈরি হওয়ায় একে অনেক জায়গায় PS (Pakistan Survey) খতিয়ানও বলা হয়; আবার প্রস্তুতের সময় বাংলা ১৩৬২ সন হওয়ায় এটি অনেকের কাছে '৬২-এর খতিয়ান' নামেও পরিচিত।

SA খতিয়ানের একটি বড় দুর্বলতা হলো, এটি কোনো মাঠ পর্যায়ের জরিপ ছিল না। জমিদারদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য ও পুরনো রেকর্ডের ভিত্তিতে বসে থেকেই এই খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়েছিল। ফলে এতে প্রচুর ভুল ও ত্রুটি থেকে গেছে, আবার কিছু এলাকায় জরিপই সম্পন্ন হয়নি। তবুও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর কোন প্রজা কতটুকু জমির মালিকানা পেয়েছে তা বোঝার জন্য SA খতিয়ান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে রয়ে গেছে।

RS খতিয়ান (Revisional Survey)

RS খতিয়ানের নমুনা

SA খতিয়ানের ভুলত্রুটি সংশোধনের লক্ষ্যে পরবর্তী সময়ে যে জরিপ পরিচালিত হয়, তাকে পুনর্বিবেচনা জরিপ বা রিভিশনাল সার্ভে বলে, আর তা থেকে প্রস্তুত খতিয়ান হলো RS খতিয়ান। ১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে ১৯৮০-৯০-এর দশক পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই জরিপ পরিচালিত হয়; কিছু এলাকায় এখনও এটি চলমান।

SA খতিয়ানের মতো নয়, RS জরিপে সরকারি আমিনরা সরাসরি মাঠে গিয়ে জমি পরিমাপ করেছেন এবং তখনকার দখল ও মালিকানা অনুযায়ী রেকর্ড হালনাগাদ করা হয়েছে। ফলে RS খতিয়ান SA খতিয়ানের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। যে সব এলাকায় BS জরিপ এখনও শেষ হয়নি, সেখানে RS খতিয়ানই সর্বশেষ প্রকাশিত স্বত্বলিপি হিসেবে গণ্য হয় এবং আদালত ও ব্যাংক লেনদেনে এটিই প্রধান দলিল হিসেবে গৃহীত হয়।

BS খতিয়ান (Bangladesh Survey)

BS খতিয়ানের নমুনা

BS অর্থ বাংলাদেশ জরিপ। স্বাধীন বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবচেয়ে সঠিক ও হালনাগাদ ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করার লক্ষ্যে যে জরিপ শুরু হয়েছে, তা BS জরিপ নামে পরিচিত। ১৯৭০-৮০-এর দশক থেকে বিভিন্ন ধাপে এই জরিপ পরিচালিত হচ্ছে এবং বর্তমানেও কিছু এলাকায় চলমান। ঢাকা মহানগরের জন্য পরিচালিত বিশেষ জরিপকে সিটি জরিপ বলা হয়, যা মূলত BS জরিপেরই অংশ।

BS খতিয়ানে জমির বর্তমান মালিক, দখলদার, দাগ ও পরিমাপের সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরা হয় বলে এটি সবচেয়ে নির্ভুল ও সর্বাধুনিক রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত। যেসব এলাকায় BS জরিপের ফলাফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে BS খতিয়ান পূর্ববর্তী খতিয়ানগুলোর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। তবে দেশের সব এলাকায় এই জরিপ শেষ না হওয়ায় অনেক জায়গায় এখনও RS খতিয়ানই কার্যকর।

চার খতিয়ানের পার্থক্য এক নজরে

  • CS খতিয়ান: ১৮৮৮–১৯৪০; ব্রিটিশ আমলের প্রথম মাঠ জরিপ; আদি মালিকানা ও আদালতের রেফারেন্সের ভিত্তি।
  • SA খতিয়ান: ১৯৫৬–১৯৬২; জমিদারি বিলুপ্তির পর দলিলভিত্তিক রেকর্ড; '৬২-এর খতিয়ান নামে পরিচিত; ভুলের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি।
  • RS খতিয়ান: ১৯৬০–১৯৯০; SA-এর ভুল সংশোধনের জন্য পরিচালিত মাঠ জরিপ; অনেক এলাকায় সর্বশেষ কার্যকর রেকর্ড।
  • BS খতিয়ান: ১৯৭০/১৯৯০–বর্তমান; ডিজিটাল ও সর্বাধুনিক জরিপ; যেখানে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

কোন খতিয়ান সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য?

সাধারণত যে খতিয়ান যত নতুন, ততই হালনাগাদ ও সঠিক বলে ধরা হয়। তাই নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে BS খতিয়ান প্রথম, এরপর RS, এরপর SA এবং সবার শেষে CS খতিয়ান স্থান পায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরনো খতিয়ান অকেজো। জমির মালিকানার ধারাবাহিক ইতিহাস বোঝার জন্য একাধিক খতিয়ান একসাথে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেমন CS খতিয়ান দেখায় জমির আদি মালিকানা, SA দেখায় জমিদারি বিলোপের পরের অবস্থা, আর RS বা BS দেখায় বর্তমান মালিকানা। কোন এলাকায় কোন জরিপ কার্যকর তার উপরও নির্ভর করে কোন খতিয়ান ব্যবহার করবেন। তাই জমি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে খতিয়ান যাচাই করাই শ্রেয়।

খতিয়ান যাচাইয়ে করণীয়

  • সর্বশেষ প্রকাশিত খতিয়ানের (RS বা BS) নকল সংগ্রহ করুন।
  • মৌজা, দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর মিলিয়ে দেখুন।
  • বিক্রেতার নাম খতিয়ানে আছে কি না যাচাই করুন।
  • কবলা দলিল ও খতিয়ানের মধ্যে মিল না থাকলে তদন্ত করুন।
  • জমির মালিকানা পরিবর্তন হলে নামজারি করে খতিয়ান হালনাগাদ করান।
  • প্রয়োজনে সরকারি ওয়েবসাইট পর্চা.গভ.বিডি বা ল্যান্ড.গভ.বিডি থেকে অনলাইনে খতিয়ান দেখুন।

উপসংহার

CS, SA, RS ও BS খতিয়ান বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রতিটি জরিপই নিজ নিজ সময়ের প্রেক্ষাপটে জমির মালিকানা রেকর্ড করার কাজ করেছে। জমি কেনাবেচা বা মালিকানা নিয়ে বিরোধে কোনো একটি খতিয়ানের উপর নির্ভর না করে একাধিক খতিয়ান ও দলিল একসাথে যাচাই করা উচিত। সবচেয়ে নতুন খতিয়ান সাধারণত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেলেও এলাকা ভেদে প্রযোজ্য রেকর্ড আলাদা হতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

বিস্তারিত জানতে খতিয়ানের ধরন গাইড পড়ুন।